নুর আলম সিদ্দিক, দিনাজপুর থেকে : সময়টা ১৯৯৫ সালের ১৩ জানুয়ারি, শুক্রবার। হাড়কাঁপানো শীতের রাত। রাত তখন সোয়া ৯টা। দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার হিলি রেলস্টেশনের ১ নম্বর লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল গোয়ালন্দ থেকে পার্বতীপুরগামী ৫১১ নম্বর লোকাল ট্রেনটি। যাত্রীরা কেউ ঘুমে আচ্ছন্ন, কেউবা গন্তব্যে পৌঁছানোর অপেক্ষায়। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই অপেক্ষাই হয়ে দাঁড়ালো জীবনের শেষ অপেক্ষা।
যেভাবে ঘটেছিল সেই ভয়াবহতা :
স্টেশনে লোকাল ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকাকালীন একই লাইনে ঢুকে পড়ে সৈয়দপুর থেকে খুলনাগামী ৭৪৮ নম্বর আন্তঃনগর ‘সীমান্ত এক্সপ্রেস’। স্টেশনে দায়িত্বরত মাস্টার ও পয়েন্টসম্যানের ভুল সংকেতের কারণে এই ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। সীমান্ত এক্সপ্রেসের ধাক্কায় লোকাল ট্রেনটির ইঞ্জিনসহ তিনটি বগি দুমড়েমুচড়ে একে অপরের ওপর উঠে যায়। মুহূর্তেই লাশের স্তূপে পরিণত হয় রেললাইন।

এক বিভীষিকাময় আর্তনাদ :
দুর্ঘটনার পর চারদিকে শুধু রক্ত আর ছিন্নভিন্ন দেহ। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সেই রাতে মানুষের আর্তনাদ আর আহাজারিতে হিলির আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ২৭ জন বলা হলেও, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ছিল শতাধিক। আহত হয়েছিলেন দুই শতাধিক যাত্রী, যাদের অনেকেই আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
অমিলিন স্মৃতি ও অপূর্ণ দাবি
ঘটনার পরদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যানকে দায়ী করা হলেও বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে রয়ে গেছে অনেক আক্ষেপ।
আজকের কর্মসূচি
প্রতি বছরের মতো এবারও হিলিবাসী কালো ব্যাজ ধারণ, মিলাদ মাহফিল এবং আলোচনা সভার মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ করছে। স্থানীয় ‘রেলওয়ে একতা ক্লাব’সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এই শোকাবহ দিনটি পালন করে আসছে। ৩১ বছর আগের সেই ক্ষত আজও হিলিবাসীর মনে টাটকা।


